অন্যদিকে এ ঘটনার পর মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এক সঙ্গে চলছে গ্রেপ্তার অভিযান। তাই গ্রেপ্তার এড়াতে দুই গ্রুপের লোকজন নিরাপদ স্থানে চলে গেছে বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী।
পুলিশ ও গ্রামবাসী জানায়, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জেলা বিএনপির সদস্য আতিক মল্লিক ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অহিদ মোল্লা এবং সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক উজির আলী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। ওই বিরোধের জের ধরে গত ২ নভেম্বর রাতে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয় তুহিন সরকার নামের এক যুবক।
গ্রামবাসী জানায়, ওই হত্যাকান্ডের পর থেকে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা একে অপরকে ঘায়েল করার লক্ষ্য নিয়ে বিপুল পরিমানের ককটেল বোমা (বিস্ফোরক দ্রব্য) ও আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ করে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করছিল। এরই অংশ হিসেবে রোববার দিবাগত রাতভর দুই গ্রুপের লোকজন গ্রামে গ্রামে মূর্হুমুহু ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিসহ নিজেদের প্রস্তুত থাকার বিষয়টি প্রতিপক্ষকে জানান দিচ্ছিল। একই সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল বোমা নিয়ে নিজ নিজ গ্রামে মহড়া দিতে থাকে রাতভর।
সোমবার দুপুর ২টার দিকে মোল্লাকান্দির চরডুমুরিয়া, রাজারচর, আমঘাটা, মহেশপুর, পূর্ব ও পশ্চিম মাকহাটী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি গ্রামে আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামগুলোর পুরুষ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছে। বসতবাড়িতে অবস্থান করছে নারী ও শিশুরা। সকলের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় চরডুমুরিয়া গ্রামের
গৃহিনী আলেয়া বেগম, মোরশেদা আক্তারের সঙ্গে। তারা জানালেন, রাতভর দুই গ্রুপের মুর্হুমুহু ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে শিশু সন্তানদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে তারা। কখন দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি বেঁধে যায় এই শঙ্কায় ঘর থেকে বের হয়নি নিরীহ মানুষ।
গ্রামবাসী জানায়, রাতভর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সোমবার ভোর সকাল ৬টার দিকে বিএনপির দুই গ্রুপের কর্মী সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সংঘর্ষে আতিক-অহিদ গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে মিলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর সরকার ও খাইরুদ্দিন গ্রুপে অংশ নেয় বলে স্থানীয় গ্রামবাসী জানিয়েছেন । সংঘর্ষে ২ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩ জন আহত হয়। তাদের উদ্ধার করে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ আরিফ মীরকে মৃত ঘোষনা করেন।
নিহত বিএনপি কর্মী আরিফ মীরের স্ত্রী পারুল বেগম বলেন, রাতভর ককটেল বিস্ফোরন হয়েছে গ্রামে। সকাল হতেই সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। এসময় আমার স্বামী বাড়ি থেকে বের হলে বিএনপি নেতা আতিক মল্লিক-অহিদ মোল্লা গ্রুপের ইউসুফ-খাইরুদ্দিনসহ ৬-৭ জন গুলি ছুড়তে থাকে। তাদের ছোড়া গুলিতে আমার স্বামী মারা যান।
স্থানীয় গ্রামবাসী জানায়, গত ২ নভেম্বর রাতে ইউনিয়নের মুন্সীকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিপক্ষ গুলি চালিয়ে তুহিন সরকারকে হত্যা করে। নিহত তুহিন দেওয়ান ওয়াহিদ-আতিক মল্লিক গ্রুপের সমর্থক ছিল। ওই হত্যার বদলা নিতেই সোমবার গুলিতে নিহত হলো আরিফ মীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির বিবদমান দুটি পক্ষের একটির নেতৃত্বে আছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদ মোল্লা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতিক মল্লিক। অপর পক্ষের নেতৃত্বে আছেন সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উজির আলী
ও বিএনপি নেতা আওলাদ হোসেন মোল্লা।
জানা গেছে, যে দল ক্ষমতায় থাকে, এ ইউনিয়নে সে দলের নেতারা আধিপত্য বিস্তার করতে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যান। তাঁদের সমর্থকদের নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। আওয়ামী লীগের আমলে চেয়ারম্যান রিপন হোসেন এক পক্ষে ও মহসিনা হক অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিতেন। বিএনপির লোকজন তখন আওয়ামী লীগের ওই দুই পক্ষের হয়ে কাজ করতেন।
গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নেতারা পালিয়ে যান। শুরু হয় বিএনপি নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি। দল ভারী করতে বিএনপি নেতাদের দুটি পক্ষ আওয়ামী লীগের লোকজনকে এলাকায় এনে নিজেদের দলে ভেড়াতে শুরু করে। তুহিনদের দলে ভেড়ায় ওয়াহিদ পক্ষ। শুরু হয় ওয়াহিদ রায়হান ও উজির আলী দ্বন্দ্ব। গত ৫ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে আটজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় এই দুই পক্ষের লোকজন হাতাহাতি ও বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায়। এসব ঘটনার জের ধরে রোববার রাত ১০টার দিকে তুহিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ ও গ্রামবাসী জানায়, আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলছে। এর জের ধরে দুই গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। গত ২ নভেম্বর রাতে তুহিনকে গুলি করে হত্যার ৮ দিনের মাথায় আবারও প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হল আরিফ মীর। দুই গ্রুপের বিরোধে ৮ দিনের ব্যবধানে ২ জন বলি হলো।
এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারী বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরে জেলা বিএনপির সমাবেশে মিছিল নিয়ে যোগ দিতে আসা বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। এর জের ধরে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা একে অপরকে ঘায়েল করতে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছিলো বলে গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে।
মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, জেলা বিএনপি নেতা আতিক মল্লিক এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রীসীদের শেল্টার দিচ্ছে। তার শেল্টার পেয়ে পলাতক থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গ্রামে ফিরে শান্ত পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তুলেছে। সোমবার ভোর সকালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর সরকার, ইউসুফ ফকির ও খাইরুদ্দিন মোল্লার নেতৃত্বে আমার লোকজনের উপর হামলা চালিয়ে আমার লোকজনকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেছে এবং বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়েছে। এ সময় তাদের গুলিতে আরিফ গুলিবদ্ধি হয়ে মারা যায়।
অপরদিকে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য আতিক মল্লিক। তিনি বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে আমি কোনো ভাবেই জড়িত না। আজকে যারা ঘটনা ঘটিয়েছে-এটা তাদের দায়। বিএনপি নেতা উজির আলী ও আওলাদ মোল্লা গ্রুপের লোকজন আওয়ামী লীগের লোকজনের সঙ্গে মিলে বিএনপির অপর গ্রুপের নেতাকর্মীদের গ্রামছাড়া করে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে আসছে।
এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে পুলিশের অভিযান চলছে।