হত্যার পর ঘাতকরা মুক্তিপণ নেয় ৭৫ হাজার টাকা
নিখোঁজ হওয়ার পর একটি চক্র তিন দফায় প্রবাসী রমজান মুন্সীর পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপন বাবদ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। পরিবারের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিলেও তাদের বুঝতে দেওয়া হয়নি রমজানকে হত্যা করার। অথচ রমজান মুন্সীকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে।
রোববার রাতে রাজধানীর কদমতলী ও শ্রীনগরে অভিযান চালিয়ে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে সিঙ্গাপুর প্রবাসী রমজান মুন্সী (৪০) হত্যার ঘটনার মুলহোতাসহ গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামী সোমবার জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে শ্রীনগর থানার ওসি মোঃ কাইয়ূম উদ্দিন চৌধুরী।
শ্রীনগর থানার ওসি মো. কাইয়ূম উদ্দনি চৌধুরী জানান, প্রবাসী রমজান মুন্সীকে শ্রীনগরের দেউলভোগ বাজারে অটোগ্যারেজে নিয়ে দাবী করা টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় হাত বেঁধে ও মুখে কসটেপ লাগিয়ে দেয়। পরে গ্যারেজ মালিক ওয়াসিম তার সহযোগী ম্যানেজার শাহিন, অটো চালক রণি ও রিয়াজের সহায়তায় রমজানের গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যার পর সেখানে গোপন স্থানে মরদেহ ফেলে রাখে। এরপর লাশ বস্তায় ভরে পাশের খালে একটি নৌকায় উঠানো হয়। নৌকা নিয়ে রওনা হলে উপজেলা পরিষদের পাশের ব্রিজের কাছে গিয়ে লাশসহ নৌকাটি তা ডুবে যায়। এ সময় তারা তীরে ওঠে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যায় বলে গ্রেপ্তারকৃত আসামীরা পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডের বিবরন তুলে ধরেন বলে জানান শ্রীনগর থানার ওসি মো. কাইয়ূম উদ্দনি চৌধুরী।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আসামীরা বলেছেন, গত
২৫ নভম্বের বেলা ১১ টার দিকে রমজান মুন্সী দেউলভোগ মোড়ে ওয়াসিমদের বিল্ডিংয়ের সামনে যায়। ওয়াসিম এ সময় দেউলভোগ বাজারে তার মালকিানাধীন অটোগ্যারেজে রমজানকে নিয়ে গিয়ে টাকা দাবী করে। সে দাবী করা টাকা দিতে অস্বীকার করলে ওয়াসিম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এ সময় গ্যারেজের ম্যানেজার শাহিন, অটো চালক রণি ও রিয়াজ তাকে বেঁধে ফেলে মুখে কসটেপ লাগিয়ে দেয়। পরে ওয়াসিম সহযোগীদরে সহায়তায় রমজানের গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা পর সেখানে গোপন স্থানে ফেলে রাখে।
জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে তারা বলেছে, এরপর দিনগত রাত ৩টার দিকে রমজানের লাশ বস্তায় ভরে পাশের খালে থাকা একটি নৌকায় উঠানো হয়। নৌকায় চড়ে তারা উপজেলা পরিষদের পাশের ব্রিজের কাছে এসে লাশসহ নৌকা ডুবে যায়। এ সময় লাশ রেখেই তারা তীরে উঠে আলাদা হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যায়। এরপর গত ২৭ নভেম্বর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় প্রবাসী রমজান মুন্সীর লাশ শ্রীনগর খালে ভেসে উঠলে পুলিশ ভাসমান অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে।
শ্রীনগর থানার ওসি কাইয়ূম উদ্দনি চৌধুরী বলনে, রোববার রাতে রাজধানীর কদমতলী ও শ্রীনগরে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ওয়াসিম খান (৩৮), সহযোগী মোহাম্মদ রনি (৩৫) ও শাহিন প্রধানকে (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের স্বীকারোক্তিতে হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
ওসি কাইয়ুম উদ্দিন চৌধুরী জানান, প্রবাসী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ২৯ নভেম্বর শ্রীনগর থানায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামীদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর পর তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে আসামীদের অবস্থান নিশ্চিত হয় পুলিশ। এরপরই রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে মূলহোতাসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওসি বলেন, অভিযানকাল প্রথমে রাজধানীর কদমতলী থেকে ওয়াসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্রীনগরের হরপাড়া থেকে শাহিন ও রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, রমজান মুন্সী সিংগাপুর প্রবাসী। দুই মাস আগে সে দেশে এসে দেউলভোগ ব্রিজের পাশে তার ক্রয়কৃত জায়গায় বহুতল ভবন নির্মানের প্রস্তুতি নেয়। এসময় তার প্লটের পাশের মালিক মুক্তার মাঝির ছেলে ইভান মাঝি জায়গা দাবী করে লোকজন নিয়ে কয়েকবার বাধা দেন। এর সূত্র ধরে গত ২৪ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে মুঠোফোনে কল দিয়ে রমজান মুন্সীকে পরদিন সকালে দেউলভোগ আসতে বলে ওয়াসিম। তাই ২৫ নভেম্বর বেলা ১১ টার দিকে কানু মিয়ার ছেলে ওয়াসিমের সাথে দেখা করতে দেউলভোগ এলাকায় যান রমজান। সেখানে যাওয়ার পর থেকে সে নিখোঁজ হয়ে পড়ে। জানতে চাইলে ওয়াসিম নিখোঁজ রমজান মুন্সীর কোন তথ্য জানাতে পারেনি। এতে স্ত্রী স্বামী নিখোঁজের ঘটনায়শ্রীনগর থানায় জিডি করেন। গত ২৭ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে উপজেলার শ্রীনগর খাল থেকে বস্তাবন্দী হাত-পা বাঁধা তিন দিন নিখোঁজ থাকা প্রবাসী রমজান মুন্সীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন রাতেই রমজান মুন্সীর স্ত্রী বাদী হয়ে শ্রীনগর থানায় অপহরণ, হত্যা করে লাশ গুমের অভিযোগে অজ্ঞাতনামাদের আসামী করে মামলা দায়ের করেন। পরেন ময়নাতদন্ত শেষে ২৮ নভেম্বর গাদিঘাট কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত রমজান মুন্সীর ১২ ও সাড়ে ৩ বছরের দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
