সিরাজদীখানে অভিযানের পর বহাল তবিয়তে চলছে বন্ধ করা ইটভাটা
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে কিছুদিন আগে কয়েকটি অবৈধ ইট ভাটাকে আর্থিক জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সে অভিযানে ভাটার আংশিক ভেঙে দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। তবে নির্দেশনা উপেক্ষা করে অভিযানের কয়েকদিন পর থেকেই বহাল তবিয়তে চলছে ভাটাগুলোর কার্যক্রম। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ হচ্ছে প্রতিবছর এমন নামমাত্র অভিযান করে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের খাম-খেয়ালি ও দুর্বলতার কারনে ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ হয় না এবং কখনো বন্ধ হবেও না।
গত সোমবার বেলা ১১ টার দিকে ভেঙে দেওয়া গ্রীন ব্রিকস নামের ইটের ভাটায় গিয়ে দেখা গেছে ইট প্রস্তুত করছে শ্রমিকরা। এছাড়া প্রস্তুতকৃত ইট বিক্রিও করা হচ্ছে। এতে ভাটাটিতে সব ধরনের কর্মযোগ্য চলছে। এছাড়া এ ভাটাটির পাশিপাশি একটি গ্রাম ও মাদরাসা রয়েছে। এ ইটভাটায় দুটি নিচুঁ চিমনি ধুয়া বের হওয়ার পথ দিয়ে অনর্গল কালো ধুয়া বের হয়ে লোকালয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদি গ্রামে সাজিদ ব্রিকসকে গিয়ে দেখা যায়,কাচা ইট রোদে শুকাচ্ছে শ্রমিকরা। অভিযানে চুল্লির নাম মাত্র ভাঙা অংশ মেরামত করে ভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছে। শ্রমিকরা চুল্লিতে কয়লা দিচ্ছেন। আগের পোড়ানো ইট ট্রাক করে ভাটা থেকে নিয়ে যাচ্ছে ক্রেতারা।
মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় তাদের তালিকায় ৫৮ টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে শ্রীনগর উপজেলায় ২ টি, গজারিয়ায় ২ টি ও সিরাজদীখান উপজেলায় ৫৪ টি ভাটা রয়েছে। এসব ভাটার মধ্যে ১২ টি ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। তারা অবৈধভাবে ইটভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ বছর ইটভাটায় দুটি অভিযান করা হয়। এর মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকায়,বেআইনিভাবে ইট পোড়ানো ও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করার কারনে সিরাজদীখান উপজেলার বাসাইল ইউনিয়নের মেসার্স শামছুদ্দিন এন্ড রবিলা ব্রিকসের মালিক আলতাফ হোসেনকে ৮ লাখ ,একই এলাকার মেসার্স ন্যাশনাল ব্রিকসের মালিক অলি আহমেদকে ৭ লাখ টাকা,মেসার্স মা ব্রিকসের মালিক জনি আহমেদকে ৭ লাখ টাকা এবং বালুচর ইউনিয়নের মায়ের দোয়া ব্রিকসের মালিককে ১০ লাখা টাকাসহ মোট ৩২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর পর গত ৮ ফেব্রুয়ারী আরো একটি অভিযানে একই উপজেলার খাজা ব্রিকসকে ৫ লাখ, সাজিদ ব্রিকসকে ৫ লাখ ও স্টার গ্রীন ব্রিকসকে ৩ লাখ ৫০ হাজার জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশনা দিয়ে ভাটার বিভিন্ন স্থাপনা গুড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে অভিযানের দুদিন পরেই এসব ভাটার কার্যক্রম শুরু হয়।
ভাটাগুলোর কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান,অভিযানে চুল্লির কিছু অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। দু’দিন পর থেকে ভাটার মালিকের নির্দেশে চুলা মেরামত করে কাজ চলছে।
ভেঙে দেওয়ার পর ইটভাটার কার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে সাজিদ ব্রিকস কোম্পানির মালিক হাজী মোহাম্মদ শাহ আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন,লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে শ্রমিক এনেছি। এখন ভাটা বন্ধ করে দিলে সব টাকা লোকসান গুনতে হবে। তাই ভাটার কাজ চলমান রেখেছি। তিনি আরো বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র জন্য কয়েক বছর আগে আবেদন করেছিলাম। সে সময় তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছাড়পত্র দিতে চেয়েছিল, আমি ঘুষ দেইনি, তখন ছাড়পত্র হয়নি। ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছি। লোকালয়ের দোহাই দিয়ে দিচ্ছেনা। অথচ আমার পাশের ভাটাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। তাকে কিভাবে দিয়েছে এটা তারাই ভালো জানে।
ভেঙে দেওয়া গ্রীন ব্রিকস ইটভাটার ব্যবস্থাপক বশির উদ্দিন বলেন,এদেশে টাকা হলে,শুধু ইটভাটা নয়, সবই চালানো যায়। আমাদের জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স আছে। পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। এ দোহাই দিয়ে জরিমানা করছে। ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ করেছি। শুনেছি অনেই ১৩-১৪ লাখ টাকা খরচ করে ছাড়পত্র এনেছে। আমরাও চেষ্টা করছি।
মুন্সীগঞ্জ ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক আব্দুল মান্নান বলেন, অভিযানের নামে ইটভাটার মালিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ বছর ইট তৈরীতে মালিক পক্ষের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে,তাই মালিকদের ভাটা না চালিয়েও উপায় নেই। তিনি আরো বলেন,যারা ইকো সিরামিক কারখানা চালাচ্ছে তারাও কয়লা জ্বালায়। ইট বানাতে কৃষি জমির মাটি ব্যবহার করে। তাদের বেলায় আইন নেই,আমাদের সাধারন ইটভাটা মালিকদের বেলা উল্টো চিত্র। আমাদের সমিতির মধ্যে ৪৮ টি ইট ভাটা রয়েছে। শুনেছি বেশ কিছু ভাটা রয়েছে যাদের পরিবেশের ছাড় পত্র নেই। তারাও পরিবেশের ছাড়পত্র নিবে।
বালুচর ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা জানান,ইটভাটার কারণে ব্যাপকভাবে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। একরের পর একর জমির উপরিভাগের মাটি কেটে পুকুর বানানো হচ্ছে। সে মাটি ট্রাকে করে সড়ক দিয়ে পরিবহনের সময় সড়ক ও বাড়িঘর নষ্ট হচ্ছে। ভাটার চিমনির ধোয়ায় পরিবেশ মারাত্মকভাবে দুষণ হচ্ছে। গাছপালার বৃদ্ধি কমেছে। ফুল-ফল ধরা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জমিতে ফসলের আবাদ কমেছে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন প্রতিবছর নাম মাত্র দু-একটা অভিযান করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে দেন। অভিযানের পরে ভাটা চলে,এতে তাদের কোন তদারকি থাকে না।গোপন ভাবে শুনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিলতাল করেই অভিযানের নাটক করা হয়। তবে পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত লোকালয় থেকে ইটভাটাগুলো সরানোর দাবি জানান তারা।
মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, অবৈধ ইট ভাটা বন্ধে অভিযান চলমান থাকবে। অভিযানের পরেও যারা ইটভাটা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, এমনটা কোথাও হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।#
