মুন্সীগঞ্জে তিন কোটি টাকার শীতকালীন সবজির চারা বিক্রির লক্ষ্য
আসন্ন শীত মৌসুম সামনে রেখে মুন্সীগঞ্জ সদর ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার গ্রামে গ্রামে সবজির বীজতলা প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কৃষককুল। স্থানীয় চাহিদা পুরণ করে বীজতলায় উৎপাদিত সবজির চারা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতি বছরই বীজতলায় সবজির চারা রোপনে স্থানীয় কৃষককূল লাভের মুখ দেখে থাকেন। তাই চলতি মৌসুমে বীজতলা থেকে ৩ কোটি টাকার অধিক সবজি চারা বিক্রি হওয়ার আশা করছেন কৃষককূল। ইতিমধ্যে চলতি মৌসুমের বীজতলা থেকে সবজির চারা বিক্রির শুরু করেছে কৃষককূল।
অন্যদিকে সবজির চারা উৎপাদনে দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ জেলা মুন্সীগঞ্জ সদরের রামপাল, পঞ্চসার, মহাকালী, বজ্রযোগিনী ইউনিয়ন এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ধামারণ, আলদী, কাঠাদিয়া,আব্দুল্লাপুর, বেতকা গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে গ্রামে বীজতলা প্রস্তুত করেছে কৃষক। ফুলকপি, বাধাকপি, লাউ, টমেটো, ব্রোকলি, কুমড়া, বেগুন প্রভৃতি সবজির চারা উৎপাদনে এখন জমিতে পুরো ব্যস্ত সময় দিচ্ছেন কৃষককূল।
সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামে গ্রামে রোপন করা বীজতলা পরিচর্চায় সারাদিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষায় বীজতলা ঢেকে রেখেছে বিশেষ ভাবে তৈরী মাঁচায়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাঁচা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন বীজতলা। পরদিন সকালে যখন রোদ উঠে মাঁচা সরিয়ে নেন। দুপুরে রোদের প্রখরতা বাড়লে মাঁচায় ঢেকে দিচ্ছেন। আবার বৃষ্টিতেও মাঁচা গুলো বীজতলায় ঢেকে দেন। তাছাড়া দুয়েকদিন পরপরই পানি ওষুধ স্প্রে করছেন।
বীজতলার সঙ্গে জড়িত একাধিক কৃষক জানান, সবজি চারা উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতি বছর আগষ্টের মাঝামাঝি সময়ে বীজতলা প্রস্তুত শুরু করেন তারা। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে চারা উৎপাদন। বীজ বোনার ২৫ দিনের ব্যবধানেই চারা বিক্রি করে থাকেন। প্রত্যেক বীজতলা তিন থেকে চার বার পর্যন্ত বীজ উৎপাদন করা যায়। প্রতি মৌসুমে দুই থেকে আড়াই কোটি সবজি চারা উৎপাদন হয়ে থাকে। যা থেকে বিক্রি হয়ে থাকে তিন থেকে চার কোটি টাকা। সবজির প্রকারভেদে প্রতি হাজার চারা বিক্রি এক হাজার টাকা থেকে ১৫০০ টাকা।
সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্য্যেরবাগ গ্রামের শিহাব সিকদার চলতি মৌসুমে ৪২ শতাংশ জমিতে বীজতলা করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। তিনি জানান, চারা উৎপাদনে বীজতলার যত্ন নিতে হয় বেশ। এতে বিনিয়োগ করে অর্ধেক পরিমান লাভ হয়ে থাকে। একই ইউনিয়নের বনিক্যপাড়া গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া ২৫ বছর ধরে বীজতলা করে আসছেন। তিনি বলেন, এখানকার বীজতলার চারা উৎকৃষ্ট মানের। এতে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকের কাছে এর চাহিদা বেশী। তাই কখনো বীজতলা করে লোকসান হয়নি।
একই ইউনিয়নের পঞ্চসার গ্রামের আমির হোসেন জানান, তিনি আগষ্টের মাঝামাঝিতে ৫০ শতাংশ জমিতে ফুলকপি ও বাধা কপির চারা উৎপাদনে বীজতলা করেছেন। প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ পড়েছে তার। ইতোমধ্যে চারা উত্তোলন করে বিক্রিও করেছেন। একই বীজতলায় আরও তিনবার চারা করবেন। আর এতে সব খরচ বাদে তিনি লাভের আশা দেখছেন।
জেলা সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের কৃষকরা বংশ পরম্পরায় বীজতলা করে আসছেন বলে জানিয়েছেন দেওয়ান বাজার গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন। তিনি ৩৫ শতাংশ জমিতে ফুলকপি, ব্রুকলি ও বাধা কপি চারার বীজতলা করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। বীজতলা থেকে উৎপাদিত চারা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবেন বলে তার আশা।
রামপাল ইউনিয়নের জোড়ার দেউল গ্রামের কৃষক হুমায়ুন মিয়া জানান, বীজতলা তৈরীতে বেশ পরিশ্রম বটে। তিনি প্রতিবছর ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার ফুলকপি-বাধাকপিসহ বিভিন্ন সবজির চারা চারা বিক্রি করেন। এতে উৎপাদন খরচ বাদে প্রতি বছর তার কয়েক লাখ টাকা লাভ হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪২৩ মেট্রিক টন সবজি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কর্মকর্তা রনি দাস জানান, শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদন লাভজনক পেশা। জেলার দুই উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষক বীজতলায় চারা উৎপাদন পেশা হিসেবে নিয়েছেন। চারা উৎপাদনে জৈবসার ও খৈল ব্যবহার হয়ে থাকে। এ কারণে এখানকার চারার গুণগত মান ভালো। তিনি আরও জানান, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এখানকার সবজি চারা কেরানীগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জ, সিলেট,কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়ে থাকে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে এ জেলায় শীতকালীন সবজি আবাদ শুরু হয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চারা উৎপাদনে বীজতলা করেছেন কৃষকরা। উৎপাদিত চারা জেলার স্থানীয় কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দেশের ২৫টি জেলায় বিক্রি হচ্ছে। এসব চারার গুনগত মান ভালো। যেসব কৃষক ভালো ফলন প্রত্যাশা করেন, দেশের যে কোনো প্রান্তের কৃষক হোন না কেন- এ চারা নিয়ে আবাদ করতে পারেন। তিনি আরও জানান, অতিবৃষ্টি ও বীজের দাম বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কৃষকরা শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
