বিয়ের জন্য চাপ দেওয়াই কাল হয়ে দাঁড়ায় প্রেমিকা শাহিদার
বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় শাহিদা ইসলাম রাফা (২৪) নামের তরুণীকে গুলি হত্যা করেছে প্রেমিক তৌহিদ শেখ তম্ময়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে কেন ও কি কারনে শাহিদাকে হত্যা করা হয় জানতে চাইলে হত্যার কারন হিসেবে উপরোক্ত তথ্য পুলিশকে জানিয়েছে ঘাতক তৌহিদ।
মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো.আজাদ হোসেন বলেন, হত্যাকান্ডের কারন জানতে চাইলে ঘাতক তৌহিদ আরও বলেন, শাহিদার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মধ্যে তৌহিদ অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিষয়টি জানতে পারে প্রেমিকা শাহিদা। এ নিয়ে তাদের একাধিকবার ঝগড়া হয়, দূরত্ব তৈরী হয় প্রেমের সম্পর্কে।
ঘাতক প্রেমিক তৌহিদ পুলিশকে আরও বলেছে, এর মধ্যে গত শুক্রবার রাতে প্রেমিক তৌহিদ শাহিদাকে মুঠোফোনের মাধ্যমে ওয়ারীর বাসা থেকে ডেকে এনে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়ায় ইলিশ খাওয়ার কথা বলে দু’জনে পদ্মা সেতু এলাকায় ঘুরতে আসে। এরপর শাহিদাকে নিয়ে তৌহিদ সারারাত এক্সপ্রেসওয়েতে ঘোরাঘুরি করে। শনিবার ভোরে তাঁরা শ্রীনগর দোগাছি এলাকায় হাটাহাটি করছিল। এ সময় শাহিদা কথা প্রসঙ্গে তৌহিদকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিলে তৌহিদ বিয়ে করতে অস্বীকার করেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তৌহিদের সঙ্গে থাকা পিস্তল দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় তৌহিদ।
মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো.আজাদ হোসেন বলেন, যে পিস্তলটি দিয়ে প্রেমিকা শাহিদাকে হত্যা করা হয়েছে। এটি গত ৫ আগস্ট ওয়ারী থানা থেকে লুট করেছিল তৌহিদ। তৌহিদকে গ্রেপ্তার পর সারাদিন কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগরের ঘটনাস্থলসহ একাধিক স্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ব্যবহৃত আলামত সংগ্রহ করতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মো. ইশতিয়াক রাসেল বলেন, শাহিদা হত্যার ঘটনার পর থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে তৌহিদকে গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের একাধিক দল কাজ করছিল। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি তৌহিদ ভোলা রয়েছে। এরপরই রোববার রাতে ডিবি পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে তৌহিদকে গ্রেপ্তারের পর তৌহিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যে অস্ত্র দিয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, সেটি কেরানীগঞ্জের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, শনিবার রাত ১২টার পর নিহতের মা জরিনা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি করেন। পরে রোববার সকালে সে মামলায় একমাত্র নাম উল্লেখ করে আসমি করা হয় তৌহিদ শেখকে।এর আগে গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়কের সমসপুর এলাকার দোগাছি সার্ভিস সড়ক থেকে ওই তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের সময় লাশের পাশে কয়েকটি গুলির খোসা পড়ে ছিল। নিহতের শরীরে আটটি গুলির ছিদ্র ছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার ভোরে শাহিদা ও তৌহিদ মহাসড়কের সার্ভিস লেনে হাঁটতে দেখেছেন পথচারীরা। এর কিছুক্ষণ পর অন্য পথচারীরা শাহিদার রক্তাক্ত লাশ সড়কে পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর পিঠে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল। পরে তাঁরা বিষয়টি পুলিশকে জানান।
ওই দিন সকাল আটটার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পিবিআই, ডিবি পুলিশের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যান। সেখানে শাহিদার হাতের আঙুলের চিহ্ন নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করে পুলিশ। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে শ্রীনগর থানায় নিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।সেখান থেকে শাহিদার মুঠোফোনে থাকা নম্বররের মাধ্যমে তাঁর মায়ের নম্বর পান।শনিবার বিকেলে তাঁর মাকে খবর দিলে তিনি থানায় এসে লাশ শনাক্ত করেন।পরে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে শাহিদার লাশ ময়মনসিংহের বরিবয়ান গ্রামের সামাজিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।
শাহিদার মা জরিনা বেগম বলেন, ছয় বছর ধরে তার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছিল তৌহিদ। বিষয়টিতৌহিদের পরিবারের লোকজনের জানতো। গত তিন মাস আগে শহিদা ও তৌহিদা সবার অজান্তে চাঁদপুরে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে তৌহিদ আমার মেয়েকে মারধর করে। পরে পুলিশ এসে দুজনকে ধরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে দুজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে তৌহিদের পরিবারের লোকজন। তখন থেকে প্রেমের বিষয়টি আমি জানতে পারি। এরপর তৌহিদের বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নেই। জানতে পারি তৌহিদ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছেলে হিসেবেও ভালো না। পরবর্তীতে আমার মেয়েকে ওই ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করি। তৌহিদ বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যেত। প্রমের অপরাধে তৌহিদের মা আমার মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। আমি আমার মেয়েকে বাড়ি থেকে বের হতে দিতাম না। শুক্রবার শহিদাকে ফুসলিয়ে ফোনের মাধ্যমে বাড়ি থেকে বের করে নেয়।শেষ পর্যন্ত আমার মেয়েটাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
নিহত শাহিদা ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার বেগুনবাড়ি বরিবয়ান এলাকার প্রয়াত আবদুল মোতালেবের মেয়ে। তিনি ঢাকার ওয়ারী এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।
