এক্সপ্রেসওয়েতে তরুণীকে গুলি করে হত্যা, পরিচয় সনাক্ত
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের দোগাছি সার্ভিস লেন সড়কে শাহিদা আক্তার (২৪) নামের এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করেছে ঘাতকরা। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মহাসড়কে তরুনীর গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সকাল ৯ টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসহ আশপাশ রেকি করে পুলিশ। বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে পিবিআই ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কমকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে তাদের উপস্থিতিতে নিহত তরুণীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য তরুণীর মরদেহ মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে। বর্তমানে তার মরদেহ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে উদ্ধার ও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরীর সময় নিহত তরুনীর লাশের পাশ থেকে ৫টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। তাই পুলিশের ধারণা করছে, খুব কাছ থেকে গুলি করে ওই নারীকে হত্যার পর লাশ এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেনের সড়কে ফেলে রেখে ঘাতক নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েছে।
অন্যদিকে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরীর সময় তরুনীর পিঠ থেকে কোমর পর্যন্ত শরীরের পেছনের অংশে ৪টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি গুলি পিঠ দিয়ে ঢুকে শরীরের সামনের অংশে মুখের নিচ দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। পিঠে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করায় মুখের নিচ দিয়ে বড় অংশ ভেদ করে বেরিয়ে গেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রীনগর থানার এস আই আরিফ হোসেন।
অপরদিকে নিহত তরুণীর পরিচয় সনাক্ত করতে নানা পন্থায় চেষ্টা চালাতে থাকে পুলিশ। এর মধ্যে উদ্ধারের পর শ্রীনগর থানায় নেওয়ার পর মহিলা পুলিশ মরদেহ তল্লাশী চালিয়ে প্যাটের পকেটে একটি আইফোন খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর আইফোনে থাকা সিম কার্ড ব্যবহার করে নিহত তরুনীর পরিচয় সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নিহত তরুণীর নাম শাহিদা আক্তার। সে ময়মনসিংহের কোতায়ালী থানার বেগুন বাড়ি বাজার গ্রামের মৃত মোতলেব হোসেন ও জড়িনা বেগমের মেয়ে। রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতো এবং ওই এলাকার এক দম্পতির ছেলে মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ করতো বলে জানা গেছে।
পরিচয় সনাক্ত হওয়ার পর পুলিশের ফোন পেয়ে বিকেলো শ্রীনগর থানায় ছুটে আসে মা জরিনা বেগম, ভাই জসিমসহ স্বজনরা। মা জরিনা বেগমের ভাষ্য মতে, হত্যাকান্ডের আগে প্রত্যক্ষদর্শীরা নিহত তরুণীর সঙ্গে যে যুবককে হাটতে দেখেছে তার নাম তৌহিদ হোসেন। তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে ছিল শাহিদার। প্রেমের কলহের জের ধরে তৌহিদ শাহিদাকে হত্যা করতে পারে বলে করছেন মা জরিনা বেগম।
শ্রীনগর ও লৌহজং সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান জানান, প্রাথমিক ভাবে থানা পুলিশ আশাপাশে খোঁজাখুঁজি করে ক্লু পাওয়ার চেষ্টা করেছে। পুলিশ ইনভেষ্টিগেশন ব্যুরো তথা পিবিআই ঘটনাস্থলে পৌছে তরুনীর ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয় তাতেও পরিচয় শনাক্ত হয়নি। নিহত তরুণীর পরনে শার্ট প্যান্ট ও জ্যাকেট পরা ছিল। পরে প্যান্টের পকেট থাকা আই ফোনের সিম কার্ড অন্য আরেকটি মোবাইল ফোন ব্যবহার পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, শনিবার ভোরে ওই তরুনীকে এক যুবকের সঙ্গে মহাসড়কে হাঁটতে দেখেছে । তার এক থেকে দেড় ঘন্টা পর তরুণীর গুলিবিদ্ধ লাশ মহাসড়কে পড়ে থাকতে দেখতে পায় স্থানীয় লোকজন ও পথচারীরা। তবে সঙ্গে থাকা ওই যুবকটিকে স্থানীয়রা চিনতে পারেনি। তার সঙ্গে আরও কেউ ছিল কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগরে তরুণীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের পর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ঘটনার কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। এ জন্য অধিকতর তদন্তের লক্ষ্যে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ঘটনাস্থলে তলব করা হয়।
পিবিআই ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের সুরতহালসহ তদন্ত কাজ করছে।
শ্রীনগর থানার ওসি কাইয়ুম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কে বা কারা এবং কি কারনে এই তরুণীকে গুলি করে হত্যা করেছে তার রহস্য উদঘাটন করতে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্তে নেমেছে। একই সঙ্গে নিহত তরুণী এবং ঘাতকদের নাম-পরিচয় সনাক্ত করারও চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। ওসি বলেন, গুলি করে হত্যার পর তরুণীর লাশ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগরের দোগাছি সার্ভিস লেন সড়কে ফেলে রেখে গেছে ঘাতক। তাই ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘাতকদের সনাক্ত করার পুলিশ কাজ করছে।
ওসি কাইয়ুম উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, উদ্ধারের সময়
লাশের পাশ থেকে ৫টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। ধারনা করা হচ্ছে, মানুষের কোলাহল না থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঘাতক ভোরে ওই নারীকে গুলি করে হত্যা করে নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েছে। তাই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্তে নেমেছে।
অভিযোগের তীর তৌহিদ নামের যুবকের বিরুদ্ধে
—————————————————–
নিহত শাহিদার মা জরিনা বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে অভিযোগ করে বলেছেন, তৌহিদ নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তৌহিদ মাদক ব্যবসায়ী ছিল এবং বখাটে প্রকৃতির হওয়ায় দু’জনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরেই তৌহিদ তার মেয়ে শাহিদাকে গুলি করে হত্যা করেছে।
মা জরিনা বেগম আরও বলেন, তৌহিদ নামের এক ছেলে সব সময় ডিস্ট্রাব করতো। ফোন করে ডাইক্যা ডাইক্যা নিয়ে যেতো। ওই ছেলের সঙ্গে বের হয়ে যেতো। আমি না করতাম আর মেয়েকে বলতাম। ছেলেডা ক্ষতি করবো। আমার কথা শুনতো না। মোবাইল ফোনে ওই ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের ছবি আছে। আমার মেয়েতো রাইতে একা বের হয় না। তৌহিদের সঙ্গেই বাসা থেকে বের অইছে।
তিনি বলেন, আমার মেয়ের লগে কয়েকবার গ্যাজ্ঞাম অইছে। তারপরও তৌহিদের সাথে বের হয় শাহিদা। কিছিদিন আগে তৌহিদের মা ১০ লাখ টাকা যৌতুকে আমার মেয়ের সাথে বিয়ের কথা বলেছিলো, আমি আরেক বাড়িতে কাজ করি, এতো টাকা পাবো কই। তৌহিদ আমার মেয়েকে মেরেছে। আমি এর বিচার চাই। তুহিনের বাড়ি বিক্রমপুর( মুন্সীগঞ্জ)। তবে পুরা ঠিকানা জানিনা।
তরুনীর ভাই মো. জসিম জানান, তার বোন রাজধানীর ওয়ারী এলাকাস্থ বলদা গার্ডেনের এক আন্টির ছেলে ও মেয়েদের স্কুল থেকে আনা নেওয়ার কাজ করতো। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে ওই আন্টির বাসায় যাওয়ার কথা বলে নিজ বাসায় থেকে বের হয় শাহিদা। ১০ বছর আগে গ্রামের বাড়ি থেকে পরিবার নিয়ে রাজধানীর ওয়ারীতে চলে আসেন। তারা ৩ বোন ও ২ ভাই।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মোহাম্মদ ফিরোজ কবির জানান, বায়োমেট্রিকের চেষ্টা করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে সুরতহালের সময় নিহতের কাছ থেকে মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। ফোনে থাকা ছবি ও সিমকার্ডের তথ্যের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরে পরিবারকে জানানো হলে স্বজনরা থানায় পৌছে মরদেহ সনাক্ত করে। তিনি আরো বলেন, এবিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জড়িতকে গ্রেফতার ও হত্যার মোটিভ উদ্ঘাটনে চেষ্টা চলছে।
