৪ ডিসেম্বর চুড়ান্ত যুদ্ধ, মুন্সীগঞ্জ মুক্ত ১১ ডিসেম্বর
একাধিক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনে নির্দেশনার পর ১০ মার্চ মুন্সীগঞ্জে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে মুক্তিপাগল ছাত্র-শ্রমিক-জনতা পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। ২৭ মার্চ ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা সিরাজদিখান থানা পুলিশ ক্যাম্পের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। ২৯ মার্চ হরগঙ্গা কলেজে তৎকালীন শহীদ মিনারে লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করা হয়। একই দিন মুন্সীগঞ্জে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় ছাত্র ও জনতা। ৩১ মার্চ পাকবাহিনী নারায়নগঞ্জে আক্রমন করলে মুন্সীগঞ্জের দামাল ছেলেরা নারায়নগঞ্জের মানুষের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ৪ ঘন্টা যুদ্ধে অংশ নেয়। ২০ এপ্রিল পাকবাহিনীর সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের মুক্তিপাগল জনতার যুদ্ধ হয়।
এরপর অনেক প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ৯ মে পাকবাহিনী ঢুকে পড়ে মুন্সীগঞ্জে। তারা গজারিয়ায় হানা দিয়ে ফুলদী নদীর তীরে ৩৬০ জেলে ও কৃষককে ব্রাশফায়ার করে হত্যার মধ্য দিয়ে মুন্সীগঞ্জে প্রবেশ করে। তারা বেশ কিছু বসতবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। গজারিয়ার চর ও জেলে পল্লীর ২’শ নিরীহ মানুষকে হত্যা ও গনহারে নারী ধর্ষনে মেতে ওঠে। ১৪ মে শহরের অদূরে কেওয়ার চৌধুরী বাড়িতে ১৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা ও ৫০ মহিলাকে ধর্ষন করে। ধলাগাওঁ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হানা দিয়ে ১০ মহিলাকে ধর্ষন করে। এছাড়া বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জনকে ধরে নিয়ে বটগাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা অব্যাহত রাখে হানাদার বাহিনী।
মুক্তিযোদ্ধারা জানায়, মুন্সীগঞ্জের মুক্তিপাগল ছাত্র যুবক ভারত থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে জুনের শেষের দিকে মুন্সীগঞ্জে ফিরে স্থানীয় ছাত্র ও যুবককে ক্যাম্প থেকে ১৫ থেকে ২০ দিনের গেরিলা প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫শ’ তে উপনীত হয়। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ১১ আগষ্ট শ্রীনগর থানা, ১৪ আগষ্ট লৌহজং থানা দখল করে মুক্তিযোদ্ধারা। সেপ্টেম্বর মাসে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের বাড়ৈখালীর শিকরামপুর হাটে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক সেনাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। নবাবগঞ্জ থেকে ৩টি গানবোট বোঝাই পাকসেনারা শিকরামপুরে পৌছলে মুক্তিযোদ্ধারা সশন্ত্র হামলা চালিয়ে তিনটি গানবোট নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এ যুদ্ধে শতাধিক পাকসেনা নিহত হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা লৌহজংয়ে গোয়ালীমান্দ্রায় অভিযান চালিয়ে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক পাক সেনাকে হত্যা করে। ২৫ সেপ্টেম্বর সিরাজদিখানের সৈয়দপুর লঞ্চঘাটে যুদ্ধে ৯ পাক সেনা নিহত হয়।
মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানায়, অক্টোবর মাসে মিরকাদিম, ধলাগাও, ও টঙ্গিবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকটি অপারেশন চালিয়ে সফলতা পায় মুক্তিযোদ্ধারা। ৪ নভেম্বর টঙ্গিবাড়ী থানা দখল এবং ৮ ও ১৯ নভেম্বর সিরাজদীখানে দুই দফা আক্রমনে পাকবাহিনী আত্নসমর্পন করে। এছাড়া ১৪ নভেম্বর রাতে ৮৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ৭টি গ্রুপে ভাগ হয়ে তুমুল যুদ্ধের পর মুন্সীগঞ্জ থানা দখলে নিয়ে ২৭টি রাইফেল লুট করে নিয়ে যায়।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় গজারিয়ায় কমান্ডর নজরুল ইসলাম পাক সেনাদের গুলিতে নিহত হন।
