নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫ । ৪:৪০ অপরাহ্ণ
৩৫ জুলাই অর্থ্যাৎ ৪ আগস্ট সকাল ১০টা। এই দিনটির কথা মনে পরতেই আতঁকে উঠে মুন্সীগঞ্জবাসী। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে মুন্সীগঞ্জ শহরের কৃষি ব্যাংক চত্ত্বরের ইসলামপুর ও ইদ্রাকপুর মোড় থেকে ছাত্র জনতার মিছিল বের হয় ।
এসময় সুপার মার্কেট এলাকার শহীদ চত্ত্বরে তাদের বাধা দেয়া হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নির্বিচারে গুলি চালালে নিহত হয় ডিপজল, রিয়াজুল ফরাজী ও সজল। আহত হয় শতাধিক।
বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সহিংসতা চালায়। হামলার পরও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেনি। শহরের কৃষি ব্যাংক চত্ত্বর, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, মানিকপুর ও হাসপাতাল সড়জুড়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মুন্সীগঞ্জের এই সহিংসতায় শহীদ হয় তিন জন।
১. নুর মোহাম্মদ সরদার ডিপজল (১৭) শহরের উত্তর ইসলামপুরে নানার বাড়িতে বড় হওয়া এই কিশোর মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তিনি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন ।
২. রিয়াজুল ফরাজী (৩৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দিনমজুর রিয়াজুল ফরাজীর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে নানা শোকের ছায়া ।
৩. মোহাম্মদ সজল (৩০) ছিলেন রং মিস্ত্রী। সহিংসতার সময় ভাইয়ের সঙ্গে খেতে বসেছিলেন। গুলির শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান। ভাই সাইফুল বলেন, “সজল বলেছিল, আজ শহীদ হবো, নয়তো স্বাধীন।”সেদিন শহরের সুপার মার্কেট চত্ত্বরে ছড়িয়ে থাকে রক্ত, পাটকেল আর বিদ্রোহী ছাত্র- জনতার সাহসের সাক্ষ্য।
ঢাকায় শহীদ হয় মুন্সীগঞ্জের ১৩ জন
১. আশরাফুল ইসলাম অন্তর (১৬)। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বানিয়াল আসেরচরের বাসিন্দা অন্তর ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে পুলিশ গুলিতে শহিদ হন। ৭ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহ শনাক্ত করেন মা হামিদা বানু ৷
২. মো. বাবুল হাওলাদার (৫২)। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মাপাড়ের গাঁওদিয়ার সন্তান বাবুল হাওলাদার। ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হন, ২৮ জুলাইপ্রাণহারান যান। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তাকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।
৩. মেহেদী হাসান প্রান্ত (১৮)। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই রাজধানীর কদমতলীতে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন। জাপানে পড়াশোনার স্বপ্ন ছিল তার। দাফন করা হয় দনিয়া ব্যাংক কলোনি কবরস্থানে।
৪. মোস্তাফা জামান সমুদ্র (১৭)। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়ার সন্তান। ১৯ জুলাই রামপুরায় আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। সিরাজদিখানে দাফন করা হয়।
৫. মো. আক্কাস আলী (৪৪)। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্যামসিদ্ধি গ্রামের বাসিন্দা । ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে আন্দোলন চলাকালে বুকে গুলিবিদ্ধ হন। দাফন হয় রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে।
৬. ফরিদ শেখ (২৯)। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপালের সুখবাসপুর গ্রামের বাসিন্দা। ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে পেটে গুলিবিদ্ধ হন, হাসপাতালে ৬ আগস্ট মৃত্যু হয়। স্থানীয় জোড়ারদেউল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৭. শারিক চৌধুরী মানিক (২৯)। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিমের রামগোপালপুরের বাসিন্দা। ৫ আগস্ট চাঁনখারপুলে সামনে থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে
শহীদ হন। ছাত্রদল নেতা ছিলেন তিনি ।
৮. মুজিবুর রহমান সরকার (৫৫)। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুরের বাসিন্দা। ২১ জুলাই কদমতলীতে নামাজ পড়তে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। মুজিবুর রহমান
সরকার ছিলেন প্রবাসফেরত।
৯. মো. সোহেল রানা (৩৭)। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোড়দৌড় গ্রামের বাসিন্দা। ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ির কাজলায় গুলি করে হত্যা করা হয় সোহেল রানাকে। ৩৪ দিন পর মৃত্যুর সনদ পায় পরিবার। তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
১০. মো. রাকিব হোসেন (২৪) । মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছা গ্রামের সন্তান। ১৯ জুলাই আফতাবনগরে গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকায় চাকরি করতেন রাকিব।
১১. আল আমিন খলিফা (১৮)। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার কাশেমনগরের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাণ।দাফন হয় নিজ গ্রাম কাশেমনগরে।
১২. সাইদুল ইসলাম শোভন (১৯)। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার উত্তর কোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা । ১৯ জুলাই রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন । চাঁনখারপুল মোড়ে তাঁর স্মরণে ‘শোভন চত্বর’ করা হয়েছে।
১৩. মেহেদী হাসান (২০)। মুন্সীগঞ্জের বড় রায়পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। বিশ্ব বিদ্যালয় পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরও সেমিস্টার পরীক্ষায় রেজাল্ট হয়। ফলাফল ভালো হলেও তা শুধুই স্মৃতির পাতায় স্থান পায়।