রাজধানীর পোস্তাগোলা সেতুর পাদদেশ থেকে মাওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। চার লেন মহাসড়কের পাশ দিয়ে গেছে সার্ভিস লেন। সেই সার্ভিস লেনগুলোতে এবং এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে এখন ডাকাতদের অভয়ারণ্য হয়ে পড়েছে। ফলে চলাচলরত যানবাহন ও যাত্রীদের মধ্যে মহাসড়কের কেরানীগঞ্জের চৌরাস্তা থেকে আব্দুল্লাহপুর, সিরাজদীখানের কুচিয়ামোড়া থেকে শ্রীনগর সীমানার কেওয়াটখালী, ষোলঘর, সমষপুর এলাকা, ঢাকা-দোহার লিংক রোড এবং লৌহজংয়ে মাওয়া পর্যন্ত একাধিক পয়েন্ট অতিক্রম করার সময় ডাকাত আতঙ্কে ভুগছেন।
এক্সপ্রেসওয়ে ও সার্ভিস লেন নিরাপদ রাখার জন্য শ্রীনগর উপজেলার হাসাড়া এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে হাইওয়ে থানা। তবে জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এই থানার সদস্যরা। মহাসড়কে পুলিশ টহল দিলেও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ
করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। গত কয়েক মাসে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সিরাজদীখান ও শ্রীনগর সীমানা ও আশপাশ এলাকার একাধিক পয়েন্টে সাধারণ পথযাত্রীদের ছাড়াও ডাকাতির কবলে পড়তে হয়েছে প্রবাসী, মাছ বিক্রেতাদোর কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেটকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ডাকাত দলগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চলতি মে মাসেই তিনটি ডাকাতি সংঘটিত করেছে তারা। এক্সপ্রেসওয়েতে সক্রিয় থাকা ডাকাতদল কখনও ডিবি পুলিশ, কখনও র্যাব পরিচয়ে ভুক্তভোগীদের তুলে নিয়ে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীদের বেশিভাগই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হয় না বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা বলেছে, হাসাড়া হাইওয়ের থানার দুইজন এসআইয়ের নেতৃত্বে দুটি টহল টিম পালা করে রাত ও দিনে টহল দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে সক্রিয় রয়েছে একাধিক ডাকাত চক্র ও ছিনতাই গ্রুপ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের কেরানীগঞ্জ সীমানার একাধিক জায়গায় ঘটছে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ের সিরাজদীখান উপজেলার ৩টি পয়েন্টে ও শ্রীনগর উপজেলার ৪টি পয়েন্টে ডাকাত দলের রাজত্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। আর অহরহ এই ডাকাতির ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে এখন ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রেৃ জানা গেছে, সর্বশেষ গত ১৯ মে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ফেরিঘাট এলাকার সড়কে মাছবাহী গাড়ির চালক ও হেলপারকে মারধরের পর হাত-পা বেঁধে ১৬৮ কার্টুন মাছসহ পিকআপ ভ্যান লুট করে নিয়ে গেছে ডাকাত দল। পরে ডাকাত দলের হামলায় আহত পিকআপ ভ্যানের চালক আবু বক্কর সিদ্দিক ও তার হেলপার আল আমিনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসা দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ অপরাধীদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানিয়েছেন শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান।
এদিকে এ ঘটনার ৩ দিন আগে গত ১৫ মে দুই সৌদি আরব প্রবাসী হলেন জমিস শেখ ও সুজন খান ঢাকা থেকে বালাসুরের উদ্দেশ্যে নগর পরিবহণের একটি বাসে রওনা হয়ে রাত ৭টার দিকে বাসটি শ্রীনগরের ফেরিঘাটে পৌঁছলে র্যাব পরিচয় দিয়ে একদল ব্যক্তি বাস থামিয়ে তাদের জোরপূর্বক নামিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাদের একজন জসিম শেখের কাছ থেকে ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা ও সুজন খানের থেকে ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ মোবাইল ফোনসহ মোট ৩৬ লাখ ৫০ হাজাট টাকা লুট করে নেয়। পরে তাদের কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ফেলে রেখে যায় ডাকাতদল।
এর আগে গত ৭ মে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যারিকেড দিয়ে গাড়ি আটকে ডাকাতির চেষ্টার ঘটনার ভিডিও দেশ-বিদেশে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এতে টনক নড়ে পুলিশের। তারা ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৫ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশ জানায়, গত ২৯ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার কাঁচপুর মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল ওয়েলমিল থেকে ৭৫ ড্রাম পামওয়েল তেল নিয়ে একটি ট্রাক ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ট্রাকটি রাত ৯টার দিকে ট্রাকটি শ্রীনগরের বেজগাঁও যাত্রী ছাউনির কাছে পৌঁছলে কালো রঙের একটি ডাবল কেবিন পিকআপে আসা ৬ জনের একটি ডাকাত দল নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ট্রাক থামায়। এরপর ডাকাতরা চালক রাসেল (২২) ও হেলপার আল-আমিনকে (২৩) হাতকড়া পড়িয়ে পিকআপে তোলে এবং জোরপূর্বক নেশাজাতীয় জুস খাইয়ে অচেতন করে ফেলে। এরপর তারা ট্রাকটি নিয়ে পালিয়ে যায়। এর আগে চালক ও হেলপারকে ছনবাড়ী-মুন্সীগঞ্জ সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায়। খবর পেয়ে শ্রীনগর থানা পুলিশ ট্রাকচালক ও হেলপারকে উদ্ধার এবং কল্লিগাঁও বড় জামে মসজিদের পাশে রাস্তার ধারে ১৮টি তেলভর্তি ড্রামসহ ট্রাকটি জব্দ করে। এ ঘটনায় ২ মে শ্রীনগর থানায় মামলা রুজু করা হয়।
শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, থানায় মামলা রুজুর পর জেলা পুলিশের একাধিক ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৪ মে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের দেয়া তথ্যে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার মেসার্স জামাল এন্টারপাইজ এ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোর থেকে ৩৫টি ড্রাম ভর্তি তেল ও ২২টি ফাকা তেলের ড্রাম উদ্ধার করে। এছাড়া ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়।
এ বিষয়ে র্যাব-১০ এর ভাগ্যকুল ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, “র্যাব পরিচয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে, তারা প্রকৃত র্যাব সদস্য নয়। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য র্যাব ইতোমধ্যেই গুরুত্ব সহকারে কাজ শুরু করেছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়া ডাকাতির চেষ্টার ঘটনা প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ শামসুল আলম সরকার বলেন, ওই ঘটনায় ৫ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ডাকাত চক্রের সক্রিয় সদস্য। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক্সপ্রেসওয়েতে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তারা। কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও ডাকাতি শুরু করেছে চক্রটি।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং থানা অন্তর্ভুক্ত। ৪টি থানা পুলিশ তাদের নিজ নিজ সীমানায় নিয়মিত টহল দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
শ্রীনগরের হাসাড়া হাইওয়ে থানার ওসি আব্দল কাদের জিলানী জানান, ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে দুরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্রেসওয়ে নিরাপদ রাখতে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও মাঝে মধ্যেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৪ মে, ২০২৫ । ৮:৫২ অপরাহ্ণ