মুন্সীগঞ্জের একাধিক বধ্যভুমি অরক্ষিত

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ । ৪:২৭ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও মুন্সীগঞ্জ জেলায় জানা-অজানা বেশ কয়েকটি বদ্ধভূমি এখনও রয়েছে অরক্ষিত, সেখানে নেই কোন স্মৃতি চিহ্ন। কালক্রমে সেই বদ্ধভূমিগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। আর যেসব বধ্যভুমি চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ ও নামফলক

স্থাপন করা হলেও অনেক শহীদদের নাম এখনো রয়েছে অজানা। এছাড়া চিহ্নিত বধ্যভূমি গুলো ১১ মাস অযত্নে অবহেলায় থাকলেও বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের শুরুতে তা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে রাজধানীর কাছের মুন্সীগঞ্জ জেলায় কয়টি বদ্ধভূমি রয়েছে, প্রশাসনসহ কারো কাছেই তার কোন সঠিক তালিকা নেই। তাই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অরক্ষিত বধ্যভুমিগুলোর তালিকা নিরূপন ও সংরক্ষন করার নির্দেশনা থাকলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে
পাকসেনারা মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গনহত্যা চালিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ৯ মে পাকসেনারা মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদী নদীর পাড়ের বেশ কিছু গ্রাম গোসাইচর, নয়ানগর, গজারিয়া, কাজীপুরাসহ বালুরচরের ৩৬০ জনকে হত্যা করে। ১০ বছর আগে এই বদ্ধভূমিতে শহীদের নাম ফলক নির্মাণ এবং ৯ বছর আগে সেখানে একটি বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ হরা হয়।

অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জে ঢুকে শহরের হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে। এই ক্যাম্পের অদূরে একটি ডোবায় অগনিত মুক্তিকামি বাঙালিকে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে ফেলে দেয় পাকসেনারা। সেই বদ্ধভূমিটি সংরক্ষণার্থে দীর্ঘ বছর পর ২০১২ সালে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। তবে কতজনকে এই বদ্ধ ভূমিতে এনে হত্যা করা হয়েছে, তার কোন সঠিক হিসাব নেই। এছাড়া ১০ মে পাকহানদার বাহিনী টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আব্দুলাপুরের পালবাড়িতে হানা দিয়ে রাতের আধারে ১৯ জনকে হত্যার পর তাদের মরদেহ পালবাড়ির পুকুর পারে ফেলে রাখে। সেখানে ১৯৯৮ সালে আব্দুলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে একটি নাম ফলক নির্মাণ করা হয়। নামফলকে অনেকের নাম পারিচয় নেই। এমনকি পালবাড়ির শহীদ পরিবারের কোনো খোঁজ খবর নিতে এ পর্যন্ত কেউ আসেনি।

অপরদিকে ১৯৭১ সালের ১৪ মে মুন্সীগঞ্জ সদরের মহাকালী ইউনিয়নের কেওয়ার চৌধুরী বাড়ীর ১৭ জনকে সাতালিখিল এলাকার খালের পাড়ে সারিবন্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাস ফায়ার করে হত্যা করে পাকবাহিনী।

খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও আজও সেই বদ্ধভূমি সংরক্ষণে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া হরগঙ্গা কলেজের অদূরে পাঁচঘড়িয়াকান্দি গ্রামের একটি জমিতে বেশ কিছু মানুষকে হত্যা করে পাক বাহিনী। গজারিয়ার ভবেরচরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও বেশ কয়েকটি বধ্যভূমি রয়েছে। এসব বধ্যভূমিতে স্মতিচিহ্ন নির্মাণের উদ্যোগ তো দুরের কথা, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কারও কাছে কোন তথ্য নেই।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন অনু ও সাতানিখিল খালপাড়ে গনহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী মো. লাল মিয়া সিকদার জানিয়েছেন, সাতানিখিল ব্রীজ সংলগ্ন খালপাড়ে ১৭ জনকে হত্যা ছাড়াও সেখানে একাধিক বুদ্ধিজীবিকে সেখানে হত্যা করা হয়। তাই মুন্সীগঞ্জের আলোচিত বধ্যভূমির মধ্যে সাতানিখিল বধ্যভূমি অন্যতম। অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বধ্যভূমি সংরক্ষনে একটি ইটও গাথাঁ হয়নি। ফলে সাতানিখিল বধ্যভূমি এখনও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের মোল্লা বলেন, জেলায় যে কয়টি বধ্যভূমি রয়েছে, সেগুলোর কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। বর্তমানে মাদকসেবীরা বধ্যভূমিগুলোকে তাদের আড্ডাস্থলে বানিয়ে তুলেছে। তাই দ্রুত এগুলো রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ফাতেমা তুল জান্নাত জানান, বধ্যভূমি সংক্রান্ত তথ-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া শহরের পুরাতন কাচারী এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিস্তম্ভ, শহরের থানারপুল এলাকায় অঙ্কুরিত মুক্তিযুদ্ধ-৭১ নামে ভাস্কর্য নির্মান, হরগঙ্গা কলেজ সংলগ্ন স্থানে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নির্মান এবং টঙ্গিবাড়ি উপজেলার আব্দুল্লাপুর পালবাড়িতে স্মৃতিফলক নির্মান, গজারিয়ায় বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক ও লৌহজংয়ের গোয়ালী মান্দ্রায় বিজয়স্তম্ভ নির্মান করা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

 

সম্পাদক : কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, প্রকাশক: নাদিম হোসাইন। ফোন : ০১৯৪৪৭৪৪৪৪০ , ই-মেইল : bikrampurpost@gmail.com কপিরাইট © বিক্রমপুর মেইল সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন