সিরাজদীখানে ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির মহোৎসব

মো. নাজির হোসেন
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ । ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলায় ধলেশ্বরী নদীসহ তিন ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির মহোৎসব চলছে। এসব মাটি পরিবহন করতে গিয়ে ধুলোবালিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকছে উপজেলার বেশ কিছু এলাকা। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক অবৈধ মাহেন্দ্রা দিয়ে এ সমস্ত মাটি ইটভাটায় পরিবহন করায় মাহেন্দ্রার বিকট শব্দ ধুলোবালিতে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের খিদিরপুর, রামকৃষ্ণদি ও নয়াগাঁও গ্রামের কৃষি জমিতে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। অর্ধশতাধিক মাহেন্দ্রা এ সমস্ত মাটি ইটভাটায় পরিবহন করছে। ধুলোবালিতে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে পুরো এলাকা।

খিদিরপুর গ্রামের তিন ফসলি জমির মাটি কেটে পাশের এবিসি নামে ইট ভাটায় বিক্রি চলছে। ওই মাটি কাটার দেখভালের দায়িত্বে থাকা আবুল কাশেম বলেন, নদীর পারের সব ইটভাটায় আমরা মাটি দেই। যে জমি হতে মাটি কাটা হচ্ছে এটার মাটি আমরা মাসুম মাষ্টারের কাছ হতে কিনছি। আমরা পতিত জমির মাটি কাটি ফসলি জমির না।

জানা গেছে, জেলার সিরাজদীখান উপজেলার লতব্দী, বাসাইল, কেয়াইন, রাজানগর, চিত্রকোট, শেখেরনগর ইউনিয়নের তিন ফসলি জমিসহ ধরেশ্বরী নদীর মাটি দীর্ঘদিন যাবৎ লুটপাট চলছে। এরমধ্যে কেয়াইন ইউনিয়নের ধলেশ্বরী নদীর প্রথম ব্রীজ সংলগ্ন স্থান হতে মাটি কাটছেন ওমর, মিন্টু গংরা। তারা ধলেশ্বরী নদীর মাটি কর্তন করে বিক্রি করছেন বিভিন্ন ইটভাটায়।
এ ব্যাপারে ওমরের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্রীজের পাশের নদীর মাটি কাটার বিষয়ে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমি ব্রীজের পাশের কোন মাটি কাটি নাই। ব্রীজের নিচের মাটি মন্টু, ইমরান কাটতেছে। আমি মাটি কিনে তারপরে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে থাকি।

এদিকে, রামকৃষ্ণদি এলাকায় মাটি কর্তন করছেন বাসাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এর ছেলে রুবেল, জামাতা জহিরুল, মিজান, শান্ত আসাদ গংরা । এ ব্যাপারে ঐ এলাকায় কৃষি জমির মাটি খণন কারী আসাদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এই কোন মাটি কাটি না। মাটি মাসুদ রানা কাটতেছে। পরে মসুদ রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কোন মাটি কাটিনা। আমার একটি ইটভাটা আছে। আমি শুধু ইটের ভাটা চালাই কোন মাটি কাটার সাথে আমি জড়িত না।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মিজান বলেন, আমরা জমির মালিক হতে মাটি কিনে তারপর কেটে ইটভাটা ও মানুষের বাড়িতে দিচ্ছি। আমরা কারো মাটি জোর করে কাটি না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভূমিদস্যুরা যখন কোন জামির মাটি কিনেন তখন ভেকু মেশিন ( মাটি খনন যন্ত্র) দিয়ে ১৫-২০ ফুট গভীর করে খাড়াভাবে মাটি কাটার কারনে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পার্শ্ববতী জমির মাটি ভেঙে পরে। তখন পার্শ্ববর্তী ওই জমির আর ফসল ফলানোর উপযোগী থাকেন বাধ্য হয়ে জমির মালিককে দালালের মাধ্যমে তাদের কাছে মাটি বিক্রি করতে হয়। ট্রাক বা ট্রলিতে ভর্তি করে জোর করে অন্যের জমির উপর দিয়ে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন ও গ্রামীন সড়ক দিয়ে এ সমস্ত মাটি নিয়ে যাওয়া হয় ইট ভাটায়। মাটি ভর্তি ট্রাক কিংবা ট্রলিগুলো সড়ক দিয়ে নেওয়ার সময় রাস্তাগুলো ভেঙে যায়। আবার ধুেলা-বালিতে এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। বাড়ি-ঘরে ধূলাবালির কারনে খাওয়া-দাওয়া, কাপড় শুকানোসহ নানা রোগ-বালাই দেখা দেয়। এতে গ্রামবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পরে।

নয়াগাঁও গ্রামের কৃষক জবান আলী বলেন, প্রতিদিন আমাদের এলাকার ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি চলছে। পাশের জামি হতে মাটি কাটার কারনে ধুলোবালি ওড়ে এসে আমাদের জমিতে পড়ছে। আমাদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। নয়াগাঁও গ্রামের অপর কৃষক সূমন বলেন, আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে প্রতিদিন শত শত মাহেন্দ্রা চলছে। মাহেন্দ্রার শব্দে রাতে আমরা ঘুমাইতে পারি না।
অন্যদিকে, ভুমির শ্রেনী পরিবর্তন করতে হলে সরকারি আইন অনুযায়ী ভুমির মালিককে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসএ শাখায় আবেদন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবেন এর পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অনুমোদন দেবেন। কোন কোন ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকও এ অনুমতি সরাসরি দেন। তবে এই নিয়মকানুনের তোয়াক্কা কোনটাই করছেন না ভূমি খেকোরা এমন কি বিক্রি করছেন নদীর মাটিও।

এ ব্যাপারে উপজেলার লতব্দী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ফসলি জমির মাটি কাটার বিষয়টি উপজেলা সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) অবহিত করেছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ শুভ্র বলেন, কৃষি জমির মাটি কাটার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি ফসলি জমির উর্বরা শক্তি আশঙ্কাজনক ভাবে হ্রাস পায়। দেশে কৃষি জমির পরিমান কমে যায় এবং বেকার হচ্ছে কৃষক। মাটি কাটার বিষয়টি আমি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করব। এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, আমরা তো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।#

 

সম্পাদক : কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, প্রকাশক: নাদিম হোসাইন। ফোন : ০১৯৪৪৭৪৪৪৪০ , ই-মেইল : bikrampurpost@gmail.com কপিরাইট © বিক্রমপুর মেইল সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন